• কিম-মুন বৈঠকের নেপথ্য নায়ক এক গোয়েন্দাপ্রধান

    fde138657448b74b8979092be890cc59 5ae56f3ade4e5 - কিম-মুন বৈঠকের নেপথ্য নায়ক এক গোয়েন্দাপ্রধান

     

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    • সম্পর্ক উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান সুহ হুন ১৮ বছর ধরে কাজ করেছেন। 
    • দক্ষিণ কোরিয়ায় রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০৮ সালে সুহ হুন চাকরি ছেড়ে দেন।
    • আনন্দের অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন সুহ হুন

    ঘটনাস্থল দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রাম পানমুনজম। সেখানকার পিস হাউসে গত শুক্রবার ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন। দুই দফা বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় তাঁরা ৬৮ বছরের যুদ্ধের ইতি টানার ও কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার ঘোষণা দেন। সব ক্যামেরার ফোকাস যখন তাঁদের দিকে; তখন পাশেই একজন অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছিলেন। তিনি আর কেউ নন, দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান সুহ হুন।

    এই অশ্রু আনন্দের। প্রায় দুই দশকের চেষ্টার পর ঐতিহাসিক অর্জনের। দুই কোরিয়ার মধ্যে বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সুহ হুন ১৮ বছর কাজ করেছেন। তাঁর চেষ্টা যে ব্যর্থ হয়নি, গত শুক্রবারের যৌথ ঘোষণাই তার প্রমাণ। ২০০০ সালে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রথম উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধের সমাপ্তি টানা। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দুই কোরিয়া যুদ্ধ চালিয়ে একটি যুদ্ধবিরতিতে যায়। তবে দুই পক্ষের শত্রুতা থেমে ছিল না। সেটারই সমাপ্তি টানার লক্ষ্য ছিল মনে।

    উত্তর কোরিয়ার তৎকালীন নেতা কিম জং-ইলকে যুদ্ধের বদলে শান্তির পথে হাঁটার আহ্বান জানাতে সুহ হুনসহ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিদলটি পিয়ংইয়ং গিয়েছিল। সেবার কোরীয় যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী প্রথম আন্তকোরীয় সম্মেলন হয়েছিল। সফলতা না এলেও আলোচনার শুরুটা অন্তত হয়েছিল। এরপর ২০০৭ সালে আরেকটি আন্তকোরীয় সম্মেলন হয়, সেই আয়োজনেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে সেটিও ব্যর্থ হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সবচেয়ে বেশিবার উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-ইলের সঙ্গে দেখা করেছেন।

    দক্ষিণ কোরিয়ায় রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০৮ সালে সুহ হুন চাকরি ছেড়ে দেন। তবে উদারপন্থী মুন জে-ইন গত বছর ক্ষমতায় এসেই তাঁকে ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। কারণ, মুন বুঝতে পেরেছিলেন, কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা চালিয়ে যেতে হলে সুহ হুনের কোনো বিকল্প নেই। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলেছিলেন, আন্তকোরীয় সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আলোচনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। মাত্র এক বছরেই তিনি প্রেসিডেন্টের আস্থার যথার্থতা প্রমাণ করেছেন। ইলের সঙ্গে সফল না হলেও তাঁর ছেলে কিম জং-উনের সঙ্গে আলোচনায় সাফল্যের দেখা পেয়েছেন তিনি।

    গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ায় পা রাখেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। ৬৫ বছর পর উত্তরের কোনো নেতার পা পড়ল দক্ষিণে। তবে কিম ও মুনের বৈঠকের সাফল্য নিয়ে সংশয় ছিল। এখন সবই অতীত। আর এই সাফল্যের বড় কৃতিত্ব সুহ হুনের। ২০১৪ সালে এক স্মৃতিকথায় তাঁকে দক্ষিণ কোরিয়ার এক নম্বর মধ্যস্থতাকারী বলেছিলেন দেশটির পুনরেকত্রীকরণ-বিষয়ক মন্ত্রী লি জং-সিউক। জং-সিউকের সঙ্গে সুহ ২০০৩ সালে পিয়ংইয়ং গিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, নব্বইয়ের দশকে দুই বছর তিনি উত্তর কোরিয়ায়ও ছিলেন। ১৯৯৪ সালে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তিনি সেখানে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি ব্যর্থ হয়।

    চুক্তি ব্যর্থ হলেও সেসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে সুহ হুনের কাজে লাগে। সিউলের ইয়নসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর কোরিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন দেলুরি তেমনটাই মনে করেন। তিনি বলেন, সুহ বুঝতে পেরেছিলেন, উত্তর কোরিয়া কীভাবে কাজ করছে আর তাদের কীভাবে থামাতে হবে। তিনি সে অনুযায়ী কাজ করছিলেন। আর এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট মুন তাঁকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

    সর্বশেষ সুহ হুন যখন কিমের সঙ্গে দেখা করেন, তখন কিম মুনের সঙ্গে দেখা করতে সম্মত হন। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মে বা জুনে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপ পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার ব্যাপারে আলোচনার আগ্রহ দেখান। পরবর্তী সময়ে কিমের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (সিআইএ) প্রধান মাইক পম্পেওর সাক্ষাতের উদ্যোগ নেন দক্ষিণের এই গোয়েন্দাপ্রধান। পম্পেও ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ায় ছিলেন।   শুধু পম্পেও নয়; উত্তর কোরিয়ার সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান কিম ইয়ং চোলের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক আছে।

    তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল ব্লু হাউস সুহ হুনের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। আর গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেও মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা যায়নি।