• দুদকের হটলাইন বাস্তবায়নে সরকারি দলই বিরোধী পক্ষ – রাকেশ রহমান।

    received 1139490959519061 - দুদকের হটলাইন বাস্তবায়নে সরকারি দলই বিরোধী পক্ষ  - রাকেশ রহমান।

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    ঢাকার প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সা¤প্রতিক খবর, ‘হটলাইনে কড়া নেড়েছে লাখের বেশি অভিযোগ’। দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য জানাতে গত ২৭ জুলাই এ হটলাইন চালু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মাত্র ১০ কর্মদিবসে ১০৬ হটলাইনে এক লাখ ১২ হাজার ফোন কল এসেছে। তার মধ্য থেকে প্রায় ৩০০ অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুসন্ধানযোগ্য অভিযোগগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘সমাজে যে দুর্নীতি চলছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুদকের আওতাবহির্ভূত কল এলেও আমরা অভিযোগকারীকে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। এতে করে ওই সব প্রতিষ্ঠানকেও সতর্ক করে দেওয়া যায়।’ দুদক জানিয়েছে, ভূমি অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ, কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), পল্লী বিদ্যুৎ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য, নারী নির্যাতন, পাসপোর্ট অফিস, রেলওয়ে, ঘুষ লেনদেন, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়া, হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলা ও অনুপস্থিতি, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষা ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়।
    দুদকের এ হটলাইন সমাজে খানিকটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে বলে মনে হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গেছে, এরই মধ্যে তারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এ উদ্যোগ কতদূর যেতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। মাত্র ১০ দিনে লক্ষাধিক অভিযোগ থেকেই ধারণা করা যায় দেশে দুর্নীতির কী ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায়। তারপরও প্রতিদিন ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ। অনুমান করা যায়- এতো অভিযোগ আসতো না যদি দুদক অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রæতি না দিতো। যদিও জনমনে প্রশ্ন, নাম-পরিচয় শেষ পর্যন্ত গোপন থাকবে তো? যদি কোনোভাবে ফাঁস হয়ে যায় তাহলে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা কে দেবে?
    হটলাইনের বাইরেও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ আছে। দেশের পত্র-পত্রিকায় প্রতিদিনই দুর্নীতির কিছু না কিছু খবর ছাপা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার একটি দৈনিকে শিরোনাম হয়, ‘পদস্থ কর্মকর্তার ঘুষের দরবার’। তাতে সরকারের একজন পদস্থ কর্মকর্তার দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ওই কর্মকর্তার ঘুষ কেলেঙ্কারি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ঘুষ নেয়া তার কাছে একেবারে মামুলি বিষয়। কোনো রাখঢাক নেই। অবলীলায় তিনি ঘুষ নিয়ে দরকষাকষি করেন। কিন্তু হঠাৎ ওএসডি হওয়ায় খানিকটা বেকায়দায় পড়েছেন। মোটা অঙ্কের ঘুষ নেয়ার পরও তিনি যাদের কাজ করে দিতে পারেননি তারা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনিও কম যাননি। মোবাইল ফোন বন্ধ করে একরকম লাপাত্তা। কিন্তু ভুক্তভোগীরাও নাছোড়বান্দা। বাসার ঠিকানা জোগাড় করে সদলবলে হাজির। অতঃপর কী আর করা। সবাইকে নিয়ে বাসার পাশে এক রেস্টুরেন্টে সমঝোতা বৈঠকে বসেন। কোনো টাকা দিতে না পারলেও টানা দু’ঘণ্টার মিটিংয়ে পাওনাদারদের আশ্বাস নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ঘুষগ্রহীতা কর্মকর্তা তাদের বলেন, ‘আমি শিগগির খাদ্য মন্ত্রণালয় বা অন্য কোথাও ভালো পোস্টিং পাব। তখন তোমাদের সব টাকা ফেরত দিয়ে দেব। আমি কারও টাকা মেরে খাওয়ার লোক না।’
    খবরটিতে মাত্র একজন কর্মকর্তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু খোঁজ-খবর করলে দেখা যাবে এ ধরনের কর্মকর্তা সংখ্যায় অনেক। আর ক্ষমতাসীন দলীয় লোকজন যে দুর্নীতি-লুটপাটে মেতেছে তার তো কোনো সীমাই নেই। মাত্র কিছুদিন আগে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সরকার মতা হারালে নেতাকর্মীদের টাকা-পয়সা নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। তিনি এই উক্তিও করেন যে, ‘দেশের টাকা লুট করে উন্নয়ন বন্ধ করে মানুষের মন জয় করা যায় না। সুতরাং দেশের উন্নয়নের খাতে ব্যবহৃত কিছু লুট করে বড় লোক হওয়ার লালসা করবেন না। কারণ সেই অর্থ ভোগ করতে হলে আপনাকে মতায় থাকতে হবে। আর এই লালসার ফলে আপনার সরকার মতায় না থাকলে আপনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একপ্রকার স্বীকার করেই নেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার দলের অনেকেই অর্থ-বিত্তে রাতারাতি ফেঁপে-ফুলে উঠেছেন। অস্বীকার করা যাবে না, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে সীমাহীন লুটপাট চলছে। শেয়ারবাজার থেকে লক্ষাধিক কোটি টাকা লুটে নেয়া হয়েছে। পথে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ৩২ লাখ ুদ্র বিনিয়োগকারীকে। এরপর লুটপাট চালিয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে লুটে নেয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এখন খেলাপি ঋণের পাহাড়। আসলে শুধু শেয়ারবাজার ও ব্যাংক নয়, দেশে বর্তমানে এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া কঠিন যেটি লুটপাটের শিকার হয়নি। অপরদিকে উন্নয়নের নামেও চলছে লুটপাট। শ’ শ’ প্রকল্পের নামে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে যেগুলো বাস্তবে নেই। আর যেগুলো আছে সেগুলোর মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। কয়েক মাস আগে বাঁধ ভেঙে পানির নিচে তলিয়ে গেছে দেশের হাওরাঞ্চল। সেখানে আজ খাদ্যের হাহাকার। বাঁধ ভাঙার কারণে জান-মাল, ফসল, মাছ, গবাদি-পশুসহ সার্বিক জীব-বৈচিত্র্যের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। এ পরিস্থিতির মূল কারণ দুর্নীতি। বাঁধ নির্মাণে নির্লজ্জ লুটপাট হয়েছে যা অনিবার্য করে তোলে বন্যাকে। সত্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে বেপরোয়া লুটপাট চলছে। মিডিয়ায় খবর বের হচ্ছেÑরডের বদলে বাঁশ, সিমেন্টের বদলে মাটি, লোহার পাতের বদলে বাঁশের চটা ব্যবহারের। উন্নয়নের নামে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে দুর্নীতির পাশাপাশি চলছে জমিদখল, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, চাকরি বাণিজ্য প্রভৃতি অনৈতিক কার্যকলাপ। কথিত আছে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর মুজিব আমলেও এমনটি ঘটেছিল। তখন দেখা গেছে, একদিকে ক্ষমতার মদদপুষ্টদের হাতে বিপুল অর্থ-বিত্ত অন্যদিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নেই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিশ্চয়তা। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে অনাহারে ও অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে কয়েক লাখ নারী-পুরুষ-শিশু মারা পড়ে। অথচ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির পাশাপাশি ুধার্ত মানুষের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রিলিফ সামগ্রী আত্মসাৎ করে অর্থ-বিত্তে তখন ফুলে ওঠে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্টরা। বর্তমানেও দেশে একদিকে অভাব-অনটন অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর নেতা-কর্মী ও তাদের নিকটাত্মীয়দের হাতে অঢেল সম্পদ। অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিদেশে টাকা পাচারের এবং বাড়ি-গাড়ি করার। আন্তর্জাতিক তথ্য, দেশ থেকে প্রতিবছর বিদেশে পাচার হচ্ছে কমবেশি ৭৫ হাজার কোটি টাকা।
    দেশের সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দুদক যে হটলাইন চালু করেছে তা সময়োপযোগী তবে এর যথাযথ বাস্তবায়ন বড় কথা। স¤প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে হবে।’ এক্ষেত্রেও বলবো, শুধু বক্তৃতা নয়, দরকার এর বাস্তব প্রতিফলন। প্রবচন আছে, ‘বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়’। মানুষ মনে করে দুর্নীতি দমন করতে হলে সবার আগে দরকার তার দলের বুভুক্ষু নেতা-কর্মীদের সামলানো। তারা অনেকেই এরই মধ্যে যে অঢেল সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন সেগুলো উদ্ধার করে জনগণকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত। কিন্তু তিনি কি তা পারবেন?

    লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি