• ১৯৮০ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকার বর্ষপূর্তী সংখ্যায় সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরীর অনুলিখনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি সাক্ষাতকার।

    FB IMG 1506158491464 - ১৯৮০ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকার বর্ষপূর্তী সংখ্যায় সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরীর অনুলিখনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি সাক্ষাতকার।

    পজিটিভ অনলাইন ডেস্কঃ

    জনাব নূরী, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কিছু প্রশ্ন করেন :

    স্বাধীনতা যুদ্ধের অগ্রনায়ক ছিলেন আপনি।
    রাজনৈতিক নেতারা যখন স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করতে ব্যর্থ হল তখন এতো বড় ঝুঁকি আপনি কেমন করে নিলেন? যখন কোথাও থেকে সাহায্য পাওয়ার ভরসা ছিল না, তখন কেমন করে সাহস করলেন মাত্র কজন তরুণ অফিসার অ্যার কিছু সংখ্যক জোয়ানকে নিয়ে এমন একটি দুধর্ষ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নামতে?

    শহীদ জিয়া সেসব প্রশ্নের প্রতি উত্তরে তার যে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন :

    সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি, সৈনিক, জনগণ সবাই।

    আর সেই ঝুঁকির কথা?

    জাতির চরম সংকটের মুহুর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হবে। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সে দায়িত্ব পালন করেছি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত কেউ যখন থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সব থেকে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হল। কারণ জাতিকে অসহায় নিরস্ত্র অবস্থায় একটা সর্বাত্বক ধ্বংসের মুখে ফেলে রাখা যায় না। এবং আমি জানতাম যুদ্ধের জন্য জাতি প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। শুধু বাকি ছিল সেই যুদ্ধের জন্য একটি সঠিক সময় বেছে নেয়া। ২৬ শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই সময়টি এলো। যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতিক্ষা করছিলাম। এবং সময় আসবার সঙ্গে সঙ্গে আমি সে ঘোষণা অষ্টম ব্যাটেলিয়ানের আমার যোদ্ধাদের জানিয়ে দিলাম। মুহুর্তের মধ্যে তাঁরা প্রস্থত হল এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো। রেডিও থেকে জাতিকে আমি সেই সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। জাতি স্বমস্বরে সাড়া দিল সেই ডাকে। বেতার তরঙ্গের সেই সন্ধ্যার ঘোষণা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রেডিওতে ধরা পড়ল। আর বিশ্ববাসী সেই প্রথম শুনল বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে। বেতার থেকে বেতারে সেই ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হল। ইথারে ঘোষণাটি উচ্চারিত হবার পর মহুর্তেই বিশ্ব মানচিত্রে অংকিত হয়ে গেলো “স্বাধীন বাংলাদেশ” কথাটি। সে ছিল সত্যি এক অলৌকিক ব্যাপার। মাত্র কয়েক কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন একটি বেতারের ঘোষণা কেমন করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়লো তা ভাবতে আজও আমার অবাক লাগে। নিশ্চয় এর মধ্যে ছিল বিশ্বস্রষ্ঠার কল্যাণময় সংকেত।

    কালুরঘাটে চটগ্রাম রেডিওর কেন্দ্র। সেখানে একদল ছাত্র ও বেতার শিল্পী দেশাত্ববোধক সঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন। শহরের চারদিকে তখন বিক্ষিপ্ত লড়াই চলছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। এক টুকরো কাগজ খুঁজছিলাম। হাতের কাছে একটা খাতা পাওয়া গেলো। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুত হাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম :

    “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। প্রিয় দেশবাসী, আমি মেজর জিয়া বলছি। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আমি হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করছি। আপনারা দুশমনদের প্রতিহত করুন। দলে দলে এসে যোগদিন স্বাধীনতা যুদ্ধে। ইনশাল্লাহ বিজয় আমাদের অবধারিত।”

    জনগণ এবং পুলিশ, আনসার, ইপিআর, ছাত্র যুবক সবাইকে জাতির প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ঘোষণা বেতারে প্রচার করলাম।

    মূলত, এই ঘোষণাটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরের। তারপর আরেকবার বিস্তারিত ভাবে বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রাদেশিক কমান্ডার-ইন-চীফ হিসেবে শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বস্তরে যুদ্ধের জন্য আহবান করা হয়েছিল।

    পরদিন সকাল থেকে ১৫ মিনিট পর পর ঘোষণাটি প্রচার করা হলো কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে। সেই ঘোষণা বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়লো সারা বাংলাদেশে। আর দলে দলে তরুণরা এসে যোগ দিতে লাগলো স্বাধীনতা যুদ্ধে।

    মূল প্রবন্ধ : “স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি”

    পহেলা মার্চ থেকেই বাংলাদেশ হামলার পাকাপাকি প্রস্তুতি নিতে শুরু করছিল পাকিস্তানী শাসক চক্র। বিমানে এবং জাহাজে করে প্রচুর সমরাস্ত্র তাঁরা পাঠালো, প্রতিদিন আসতে লাগল নতুন নতুন সেনাদল। চট্টগ্রামের ষোল শহর ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর সদর দপ্তর। নতুন একটি ব্যাটেলিয়ান গড়ে তুলবার কাজ চলছিল কিছু কাল আগে থেকে। এটি অষ্টম ব্যাটেলিয়ান। নতুন এই ব্যাটেলিয়ানের দু’শ জনের একটি দলকে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পাকিস্তানের খারিয়ান অঞ্চলে। এদিকে বেশির ভাগ জোয়ানই ছিল ছুটিতে। মাত্র দু’শ কুড়ি জন ছিল ডিউটিতে। অস্ত্রও ছিল সামান্য। অস্ত্র বলতে ছিল ৩০৩ মডেলের কিছু রাইফেল, চারটি এল-এম-জি, দু’টি মর্টার, সার্ভিস কেবল দু’টি আর সামান্য গোলাবারুদ। কোন এন্টিট্যাঙ্ক বা ভারি মেশিনগান ছিল না।

    চট্টগ্রামে ১লা মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি থেকে আমরা সুস্পষ্ট আঁচ করতে পারছিলাম কি ঘটতে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে তারা শহরের মহল্লায় গিয়ে নিধনযজ্ঞে মেতে উঠত। আমাদের জোয়ানকে গোপনে মোতায়েন করলাম তাদের দিকে নজর রাখার জন্য। আমি তখন ব্যাটেলিয়ানের দ্বিতীয় কমান্ডিং অফিসার। পাকিস্তানী অফিসার লেঃ কর্ণেল জানজুয়া ছিলেন ব্যাটেলিয়ান প্রধান। তিনি প্রথম থেকেই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখছিলেন। আমার বাসার কাছে ঘোরাঘুরি করছিল তার নিয়োজিত গোয়েন্দারা। এদিকে ক্রমেই ওদের পরিকল্পনার নীলনকশা স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল আমাদের কাছে। দেশের নানা জায়গায় ওদের নৃশংস বর্বরতা ও লুটতরাজের খবরও পৌঁছাতে লাগল। খবর পাওয়া গেল ব্যাটেলিয়ানদের নিরস্ত্র করা হবে। ব্যাটেলিয়ানের তরুণ অফিসার দল এবং প্রধান জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারদের মধ্যে তখন এক চরম উত্তেজনা। তারা আমাদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত জানার জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন। ব্যাটেলিয়ানের কোয়ার্টার মাস্টার ছিলেন ওয়ালী আহমদ। শমসের মবীন ও খালিকুজ্জামান তখন ক্যাপ্টেন। তারা ওয়ালী আহমদ (ওলী আহমদ) ও মেজর শওকত এর মাধ্যমে আমাকে বলে পাঠালেন, আমি যদি স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করি তারা সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্র হাতে তুলে নেবেন। এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য সবাই জীবন উৎসর্গ করবেন। জেসিও এবং এনসিও গণও আমার বাসায় আসতে লাগলেন। তারা বললেন, “একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। তা না হলে বাংলাদেশের জনগণকে চিরকালের জন্য ক্রীতদাসে পরিণত করা হবে।” বোধকরি তারিখটা ছিল ৪ঠা মার্চ। কোয়ার্টার মাস্টার কর্নেল ওলীকে ডেকে পাঠালাম। ষোল শহর মার্কেটের ছাদের উপর আমরা বসলাম। এটি আমাদের প্রথম বৈঠক। আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। কী সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হবে। সোজাসুজি তাঁকে বললাম, “স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। আমাদের এখন থেকে সর্বক্ষণ প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে।”

    পরবর্তি বৈঠকে ক্যাপ্টেন ওলী আহমদ মেজর আমিন চৌধুরী ও লে. ক. এম আর চৈৗধুরীও যোগ দিলেন। প্রথম বৈঠকে একটি একশান প্লান এর রূপরেখা তৈরি করা হল। তার ভিত্তিতে রোজ একই জায়গায় আমরা বৈঠকে মিলিত হচ্ছিলাম। নিঃশব্দে একইভাবে চলল আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতির কাজ।

    ১৩ই মার্চ নেতাদের সাথে ইয়াহিয়া খানের গোলটেবিল বৈঠক শুরু হল। এর মধ্যেই পাকিস্তানী জেনারেলরা একের পড় এক বিমানে করে আসতে লাগল। গ্যারিসন অফিসে শুরু হল তাদের আনাগোনা। এ ছিল সর্বাত্মক হামলার এক ভীতিকর পূর্বাভাস। নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানো হল চট্টগ্রামে। রণতরী, পিএনএস “বাবর” এর সঙ্গে এলো অনেকগুলো ডেস্টচ্ছার, ফ্রিগেট, আর গানশিপ।

    ২১শে মার্চ জেনারেল হামিদ এলেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। এই জেনারেলই পাকিস্তানের সামরিক হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। চট্টগ্রামে তখন জনগণের তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। রাস্তায় রাস্তায় ছিল ব্যারিকেড। “সোয়াত” জাহাজের অস্ত্র খালাস করার জন্য পাকিস্তানী সৈন্যরা ২৪শে মার্চ ব্যারিকেড সরিয়ে কোনমতে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছল। পথে জনগণ তাদের বাধা দিয়েছিল। এটি ছিল চরম মূহূর্তের সংকেত। আমরা প্রস্তুত হয়ে থাকলাম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

    দ্রুত ঘনীয়ে এলো ছাব্বিশের সেই রাত। রাত তখন ১১টা। চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য ব্যাটেলিয়ানের কমান্ডিং অফিসার আমার কাছে নির্দেশ পাঠালেন। নৌবাহিনীর একটি ট্রাক পাঠানো হলো আমাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। দু’জন পাকিস্তানী অফিসারকে আমার সাথে দেওয়া হল। ট্রাকের চালক ছিলেন একজন পাঞ্জাবী। আমার সাথে ছিল আমার ব্যাটেলিয়ানের মাত্র তিনজন জোয়ান। এত রাতে কেন তারা আমাকে বন্দরে রিপোর্ট করতে পাঠাচ্ছে? একটা সংশয় আমার মনে দানা বেধে উঠছিল। আসলে তারা আগেই টের পেয়েছিল। আমি চরম একটা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। সুতরাং তারা চাইছিল আমাকে শেষ করে ফেলতে। তাই সে রাতেই তারা ষড়যন্ত্র এটে রেখেছিল।

    আগ্রাবাদের একটি বড় ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থেমে গেলো। আমি নেমে পায়চারি করছিলাম রাস্তায়। ভাবছিলাম কখন সবাইকে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেব? ঠিক সে সময়ে মেজর খালিকুজ্জামান সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনুচ্চস্বরে বললেন, ওরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা শুরু করেছে। শহরেও অভিযান চালিয়েছে। হতাহত হয়েছে শহরের বহু নিরীহ মানুষ।
    বুঝতে পারলাম যে সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম “উই রিভোল্ট” নির্দেশ দিলাম। ষোল শহরে ছুটে যাও। পাকিস্তানী অফিসারদের আটক করো। যুদ্ধের জন্য তৈরি করে রাখো ব্যাটেলিয়ানদের সবাইকে। ট্রাকে উঠে পাঞ্জাবী ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলাম ট্রাক ফিরিয়ে নিয়ে চলো ব্যাটালিয়ান হেড কোয়ার্টারের দিকে। সৌভাগ্য বলতে হবে। সে নিঃশব্দে আমার নির্দেশ পালন করলো।

    ষোল শহরে এসে দ্রুত নেমে পড়লাম ট্রাক থেকে। নৌবাহিনীর আটজন এসকর্ট ছিল আমার সঙ্গে। মুহুর্তে একটি রাইফেল কেড়ে নিলাম তাদের একজন কাছ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী নেভাল অফিসারটির দিকে রাইফেল তাক করে বললাম, “হ্যান্ডস আপ”। তোমাকে গ্রেফতার করা হল। ঘটনার আকস্মিকতায় সে হকচকিয়ে গিয়ে আত্মসমর্থন করলো। অন্যদের দিকে রাইফেল উঁচিয়ে বলতেই তারা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে অস্ত্র নামিয়ে রাখল। ব্যাটেলিয়ান কমান্ডারকে ঘুম থেকে তুলে এনে পাকড়াও করা হল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে এলাম। লে. কর্ণেল চৌধুরী এবং ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। সিভিল টেলিফোন সার্ভিসের একজন অপারেটরকে টেলিফোনে পেলাম। তাঁকে বললাম,” ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ান স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা করেছে। এ সংবাদটি যেন চট্টগ্রামের ডিসি, কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি আর রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়ে দেয়।” কারণ টেলিফোনে আমি তাদের কাউকে পাচ্ছিলাম না। টেলিফোন অপারেটর দারুণ আনন্দ প্রকাশ করল আমার কথায়। এবং ঐ গভীর রাতেই সবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল সে।

    ২৬শে মার্চ, ১৯৭১ ছিল জাতির ইতিহাসে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ব্যাটেলিয়ানের সব অফিসার আর জোয়ানদের এক জায়গায় একত্র করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলাম। বললাম, “আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছি। উই রিভোল্ট ফর আওয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট।” তারা এই ঘোষণার জন্যই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উল্লাস ধ্বনি করে সাড়া দিল। পর মুহুর্তেই স্বসস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাত তখন ২ টা ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ, ১৯৭১। জাতির জন্য অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তটি। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু হল।

    (“স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি” প্রবন্ধটির এই পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক ক্রমে প্রায় অনেক লেখাই লিপিবদ্ধ হয়েছে “একটি জাতির জন্ম” প্রবন্ধটিতেও। তাই ভিন্ন করে আরেকটি পোষ্ট দেয়া অর্থহীন বিধায় নীচের লিংকটিতে যেয়ে “একটি জাতির জন্ম” প্রবন্ধটি পড়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জ্ঞাপন করছি।)

    https://m.facebook.com/story.php…

    রাতে রেল লাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে আমরা যাত্রা করলাম। পথে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর একশজন আমাদের সাথে যোগ দিল। দুপুরে পটিয়ার পাহাড়ে পৌঁছে গেলাম। জাতির সেই প্রথম স্বাধীনতা যোদ্ধাদের পথে পথে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানালো জনগণ। তারা খাবার নিয়ে আসল ক্ষুধার্ত সৈনিকদের জন্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘাটি হল পটিয়ার পাহাড়। সেই প্রথম পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমর। বহু দেশপ্রেমিক প্রাণ দিলেন দেশের মাটিকে মুক্ত করার জন্য। পাকিস্তানী শিবিরে তখন আতংক। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হল। আমরা এখন সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত।

    এপ্রিলের প্রথম থেকে শুরু হয়ে গেল সারাদেশ জুড়ে ব্যাপক যুদ্ধ। জনগণ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে এগিয়ে এলো। অস্ত্রের নিদারুণ অভাব। প্রশিক্ষণ দেওয়া গেরিলারা হানাদারদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে আনতে লাগল। সে অস্ত্র দিয়ে চলছিল যুদ্ধ। এপ্রিলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের হেড কোয়ার্টার সরিয়ে নেওয়া হল রামগড়ে।

    এরপর বিজয়ের পর বিজয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই উত্তর-পূর্ব সেক্টরের গোটা রৌমারী থানা, চিলমারী, উলিপুর ও দেওয়ানগঞ্জ হানাদার মুক্ত হল। ২৮শে আগস্ট এই অঞ্চলে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসন চালু হল। সেদিন রৌমারীতে বলেছিলাম,

    “এখানে স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে আজ রচিত হল এক যুগান্তকারী অধ্যায়। মুক্তাঙ্গনের এই অভিযাত্রা থেকে অচিরেই গোটা বাংলাদেশের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ঘটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের অনিরুদ্ধ জাতীয় চেতনাই স্বাধীনতা যুদ্ধের চালিকা শক্তি। এর প্রচণ্ড স্রোতের মুখে খরকুটার মত ভেসে যাবে দখলদাররা। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে বৈদেশিক আধিপত্তের সব কুটিল ষড়যন্ত্র।

    অনলাইন থেকে নেয়া।