• Category Archives: শিল্প ও সাহিত্য

    তাঁর স্মরণে, তাঁকে নিবেদন

    6cf726b0cb04c1cb767ca64352f3ea35 5afe6a5593c11 - তাঁর স্মরণে, তাঁকে নিবেদন

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    গত ৯ মে প্রয়াত হয়েছেন লেখক, সম্পাদক ও জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই লেখা।
    আমাদের কালের একজন বিশিষ্ট ও প্রাতিস্বিক মানুষ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম চলে গেলেন চিরদিনের মতো। চলে গেলেন বটে কিন্তু রেখে গেলেন অতুলনীয় কিছু বৈভব, অনুপম কিছু সৃষ্টি। লেখক, গবেষক, সম্পাদক, সংস্কৃতিকর্মী, সমাজচিন্তক—সর্বোপরি একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে সমকালে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। উত্তরজীবনে টেলিভিশন-উপস্থাপক হিসেবে পেয়েছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম সারথি। এমন একজন গুণী মানুষকে হারিয়ে আমরা বিপন্ন, বিষণ্ন, বিহ্বল।

    ১৯২৭ সালের ১ মে ইতিহাসখ্যাত মহাস্থানগড়ের ঐতিহাসিক মাটি গায়ে মেখে করতোয়ার তীরে জন্ম নিয়েছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। কালের দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে একানব্বই পূর্ণ করে বিরানব্বই বছরে পদার্পণের পরপর তিনি চলে গেলেন অনন্তের পথে। চলে যেতে হবে বলেই বোধ করি বেশ আগেই ভাবনাচিন্তা করে আত্মজীবনীর নাম রেখেছিলেন নিবেদন ইতি। শিরোনাম বলে দিচ্ছে সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার প্রসঙ্গটা।

    পিতা সা’দত আলী আখন্দের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। এরপর তিনি কাটিয়েছেন এক বর্ণাঢ্য জীবন। সে বর্ণাঢ্য জীবনে অনেক পরিচয়ে তিনি ছিলেন বিশিষ্ট। করাচি, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। শেষ জীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় অনন্য অবদানের জন্য অলংকৃত করেছিলেন জাতীয় অধ্যাপকের পদ। তিনি যেমন শিক্ষকতা করেছেন তিন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তেমনি শিক্ষার্থীও ছিলেন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর, লন্ডন বিশ্ববিদ্যারয় থেকে পিএইচডি। এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের শিক্ষকতা-জীবনকে বর্ণাঢ্য করে তুলতে সাহায্য করেছে। জীবনে তিনি বহু ছাত্র তৈরি করেছেন, জাতির শিক্ষা-উন্নয়নে রেখেছেন অনন্য অবদান। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীর চেতনায় তিনি সঞ্চার করতেন আধুনিক মানুষ হওয়ার বীজমন্ত্র। ভালো ছাত্র তৈরি করার চেয়ে ভালো মানুষ সৃষ্টি করার দিকেই ছিল তাঁর মৌল লক্ষ্য। এ জন্যে শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীর বোধে-চেতনায় সঞ্চার করতেন ইতিবাচক জীবনবোধ ও প্রগতিশীল বিশ্ববীক্ষা।

    একজন গবেষক হিসেবে মুস্তাফা নূরউল ইসলামের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। ‘বেঙ্গলি মুসলিম পাবলিক ওপিনিয়ন অ্যাজ রিফ্লেক্টেড ইন বেঙ্গলি প্রেস’ বিষয়ে ১৯৭১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এই অভিসন্দর্ভ তাঁকে উচ্চমানের গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। মুসলিম সমাজচেতনার স্বরূপ অনুধাবনে এখন এই বই পালন করছে আকর গ্রন্থর ভূমিকা। তাঁর এই অভিসন্দর্ভটি বেঙ্গলি মুসলিম পাবলিক ওপিনিয়ন শিরোনামে প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। একই ধারার তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা দুখণ্ডে রচিত সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত (প্রথম খণ্ড, ১৯৭৭; দ্বিতীয় খণ্ড, ২০০৫)। বিপুলায়তন এই বইয়ে সাময়িকপত্রে প্রতিফলিত জীবন এবং এ অঞ্চলের মানুষের নানামাত্রিক মত-অভিমত সংকলিত হয়েছে।

    সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ১৮৩১ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত মুসলিম ব্যক্তিবর্গ সম্পাদিত মোট একচল্লিশটি সাময়িকপত্র থেকে জীবন ও জনমত-বিষয়ক রচনা সংকলিত হয়েছে। রচনাগুলোকে শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, আত্মচেতনাবোধ ও আত্মজাগরণ, মুসলিম বিশ্ব, রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমান, অর্থনীতি, ভাষা ও সাহিত্য এবং বিবিধ—এই দশটি শাখায় বিন্যাস করে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখাই বাহুল্য যে, যে সময়ে বসে গবেষক এই কাজ করেছেন, তখন অনেক পত্রপত্রিকাই দুষ্প্রাপ্য হয়ে গিয়েছিল। অক্লান্ত পরিশ্রম করে নানা জায়গায় ঘুরে বহু মানুষের সহযোগে তিনি রচনা করেন এ বই। প্রসঙ্গত স্মরণীয় লেখকের নিম্নোক্ত ভাষ্য:

    ১৮৩১-১৯৩০ শতবর্ষ কালে প্রকাশিত সকল পত্রপত্রিকার সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। কেননা অধিকাংশই ইতিমধ্যে দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। বেশ কিছুসংখ্যক পত্রিকা সম্বন্ধে বিভিন্ন সূত্রে প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি সংগ্রহ করা গেছে বটে, কিন্তু সবগুলির মূল ফাইলের সাক্ষাৎ আমরা পাইনি। তবু যাই হোক, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রক্ষিত যে সকল পত্রিকা দেখবার সুযোগ আমরা পেয়েছি, তা থেকে মোট একচল্লিশটি পত্রিকা নির্বাচন করে বর্তমান গ্রন্থে ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রন্থমধ্যে বহুল উদ্ধৃত কয়েকটি সাময়িকপত্রের এখানে নামোল্লেখ করা গেল—আল-এসলাম, ইসলাম-দর্শন, ইসলাম-প্রচারক, কোহিনুর, ছোলতান, নবনূর, নূর-আল-ইমান, প্রচারক, বঙ্গনূর, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, বাসনা, মাসিক মোহাম্মদী, মিহির ও সুধাকর, মোয়াজ্জিন, মোসলেম দর্শন, রওশন হেদায়েৎ, শরিয়ত, শরিয়তে এসলাম, শিখা, সওগাত, সাম্যবাদী ইত্যাদি।

    মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকার প্রচ্ছদমুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকার প্রচ্ছদবিভিন্ন সাময়িকপত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যাবলি গবেষক যেভাবে দশটি শাখায় বিন্যাস করেছেন, তা থেকে প্রতিটি স্বতন্ত্র বিষয় সম্পর্কে জনমত বিকাশের ক্রমধারা সমন্ধে স্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব। বিষয়ের এই ক্রমবিন্যাস ধারাটাই এ বইয়ের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত-এর দ্বিতীয় খণ্ডে ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মুসলিম ব্যক্তিবর্গ সম্পাদিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে নির্বাচিত অভিমত সংকলিত হয়েছে। এই খণ্ডে প্রধানত যেসব সাময়িকপত্র থেকে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে—সওগাত, শিখা, মাসিক মোহাম্মদী, ছুন্নত অল-জামায়াত, মোয়াজ্জিন, শরিয়তে এসলাম, ইমাম, আল-ইসলাহ্, হেদায়াত, ছায়াবীথি, বুলবুল, গুলিস্তাঁ, নওরোজ, নেদায়ে ইছলাম, জয়তী ইত্যাদি। দ্বিতীয় খণ্ডের বিষয়সমূহকে গবেষক এগারোটি ধারায় বিভক্ত করে বিন্যাস করেছেন। ধারাগুলো এ রকম—শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, জাগরণ, মুসলিম চেতনাবোধ, হিন্দু-মুসলমান প্রশ্ন, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা-সাহিত্য, মুসলিম দুনিয়া, আন্তর্জাতিক এবং বিবিধ। একটি বিশেষ কালখণ্ডে দেশবাসীর মনোভাব কেমন ছিল, কেমন ছিল তাদের চিন্তাভাবনা, সে বিষয়টা আলোচ্য গ্রন্থ রচনার মূল লক্ষ্য বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। প্রসঙ্গত প্রণিধানযোগ্য লেখকের এই ভাষ্য:

    …বর্তমান গ্রন্থ-প্রস্তুতির প্রধান উদ্দেশ্য—ইতিহাসে পাঠ-গ্রহণ। ধারাবাহিকতার একটি চিহ্নিত কালপর্বে স্বদেশের, দেশবাসী মানুষের অবয়ব কেমনতর ছিল, এবং নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমন্বয়ে অবয়বটি কেমনভাবে নির্মিত হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের সন্ধান নিতে চাই।…গভীরে-বিস্তারে ব্যাপকতায় পটভূমি রয়ে থাকে। সেইখানে নানান স্রোতের উথালি-পাথালি। অতঃপর ধারাবাহিকতায় সবটা বহমান।

    মুস্তাফা নূরউল ইসলামের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই সমকালে নজরুল ইসলাম (১৯৮৩)। ১৯২০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকপত্রে নজরুলের জীবন ও সাহিত্যকর্ম-বিষয়ক রচনার সংকলন এটি। নজরুল-গবেষণায় এ এক আকর বই। কেননা, যেসব সাময়িকপত্রে নজরুলবিষয়ক রচনা প্রকাশিত হয়েছে, তার অধিকাংশই এখন দুর্লভ। তাই এ বইয়ের শরণ ছাড়া উত্তরকালীন গবেষকদের কোনো বিকল্প নেই। গবেষক হিসেবে মুস্তাফা নূরউল ইসলামের নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও প্রযত্নের ছাপ আছে এই বইয়ে।

    গবেষণার বই ছাড়াও বিভিন্ন শাখায় আরও কিছু পুস্তক লিখেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন। আছে তাঁর বেশ কিছু সম্পাদিত বই। মুস্তাফা নূরউল ইসলামের বিভিন্ন বইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখখোগ্য: শিশু-কিশোর সাহিত্য: ভীষণ প্রতিশোধ (১৯৫৫), জাপানি ভূত (১৯৫৫) ; গবেষণা/প্রবন্ধ: মুসলিম বাংলা সাহিত্য (১৯৬৮), মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা (১৯৭০), সময়ের মুখ, তাঁহাদের কথা (১৯৯৭), আপন ভুবন (২০০১) নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০৪) ; সম্পাদনা: নজরুল ইসলাম (১৯৬৯), উচ্চ শিক্ষায় এবং ব্যবহারিক জীবনে বাংলা ভাষার প্রয়োগ (১৯৭৬), আমাদের মাতৃভাষা চেতনা ও ভাষা আন্দোলন (১৯৮৪), বাংলাদেশ: বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (১৯৯০), নজরুল ইসলাম: নানা প্রসঙ্গ (১৯৯১), আবহমান বাংলা (১৯৯৩), আমাদের বাঙালিত্বের চেতনার উদ্বোধন ও বিকাশ (১৯৯৪), পূর্বমেঘ: নির্বাচিত প্রবন্ধ (যৌথ, ২০০২), শিখা সমগ্র (২০০৩), সেরা সুন্দরম (২০০৭); আত্মজীবনী: নিবেদন ইতি (পূর্বখণ্ড ২০০৫, উত্তরখণ্ড ২০০৬) ; অনুবাদ: কাউন্ট অব মন্টোক্রিস্টো (১৯৫৫), বাংলাদেশে মুসলিম শিক্ষার ইতিহাস এবং সমস্যা (১৯৬৯) ইত্যাদি।

    তাঁর বইয়ের মধ্যে আত্মজীবনী নিবেদন ইতির কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। এটি তাঁর ব্যক্তিজীবনের কথা, তাঁর হয়ে ওঠার কাহিনি। তবে এ কথা, এ কাহিনি যতটা তাঁর নিজের, তার চেয়ে অনেক বেশি তাঁর কালের, তাঁর সময়ের স্বদেশের। বস্তুত, আত্মকথার আড়ালে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম তুলে ধরেছেন তাঁর সময় ও সমকালকে, দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন তাঁর স্বদেশকে। এ বইয়ে লেখকের ‘আপন কথায় স্বভাবতই এসেছে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা, অপর পক্ষে প্রাসঙ্গিক সম্পৃক্ত পটভূমিতে বহমান কালের যাত্রা।’ এ বইয়ে লেখক নিজে কথা বলেছেন, নাকি বলব কাল বা সময়ই তাঁকে দিয়ে কথা বলিয়ে নিয়েছে? বাংলাদেশের ইতিহাস আর সংস্কৃতির সঠিক পরিচয় পেতে বইটি পাঠককে সাহায্য করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

    মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ভুবন। তিনি সংবাদ পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মিল্লাত-এর, যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত বেগম পত্রিকার সঙ্গে। ফজলে লোহানী সম্পাদিত বিখ্যাত অগত্যা (১৯৪৯)-এর সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথাও সুবিদিত। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত পূর্বমেঘ (১৯৬০) সাময়িকপত্রের কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। ষাটের দশকে পূর্ববাংলায় উন্নত সাহিত্যরুচি বিকাশে পূর্বমেঘ পালন করেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৬০ থেকে ১৯৭১—একটানা এগারো বছর এ পত্রিকাটি প্রকাশ করেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম।

    সুন্দরম (১৯৮৬) সম্পাদনা তাঁর সাহিত্য সাধনার এক অনন্য কীর্তি। সুন্দরম-এর প্রতিটি পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকত তাঁর মেধা মনন রুচি আর প্রযত্নের স্বাক্ষর। প্রায় একাই তিনি পত্রিকার গোটা কাজ করতেন। নিপুণ হাতে সম্পাদনা করতেন। প্রবীণ-নবীন—উভয় ধরনের লেখকের রচনা ছাপা হতো সুন্দরম-এ। এ পত্রিকায় লেখা মুদ্রিত হওয়া একসময় তরুণ লেখকদের কাছে ছিল আনন্দ আর আবেগের উৎস। এমন ঝকঝকে রুচিশীল পত্রিকা দুই বাংলায় ছিল একেবারে হাতে গোনা। কম-বেশি যাই হোক না কেন, সুন্দরম-এ প্রকাশিত প্রতিটি রচনার জন্য তিনি সম্মানী দিতেন। এটাও তাঁর কাছ থেকে একটা শিক্ষণীয় বিষয়।

    রেডিও-টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি রেখে গেছেন এক স্বকীয়, বৈশিষ্ট্য। তাঁর উপস্থাপনায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মুক্তধারা’ কিংবা ‘বাঙালির বাংলা’, এটিএন বাংলার ‘কথামালা’ অনুষ্ঠান ছিল অতি জনপ্রিয় শিক্ষণীয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় তাঁর স্বকীয়তা ছিল সবিশেষ আকর্ষণীয়। আর অনুষ্ঠানের বিষয়-নির্বাচন তো ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর এবং কৌতূহলোদ্দীপক। ভাবা যায়, অনুষ্ঠানের বিষয় ‘তুমি’, ‘বাজে কথা’, ‘গুজব’ কিংবা ‘কি কথা তাহার সাথে’! ষাটের দশকে বেতারে নানা অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় মুস্তাফা নূরউল ইসলাম রেখেছেন তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর।

    মুস্তাফা নূরউল ইসলামের কর্ম ও সাধনার সংক্ষিপ্ত কথা লিখতে লিখতে মনে পড়ছে তাঁর সঙ্গে আমার সংযোগের কথা। সুন্দরম পত্রিকায় লেখা দেওয়া সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ। সেই ১৯৮৬ থেকে ২০১৮—দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় স্যারের নিবিড় সান্নিধ্য ও সাহচর্যে ধন্য আমি। সুন্দরম পত্রিকায় লেখা সংগ্রহের দায়িত্ব দিতেন আমাকে স্যার—কোন লেখা যাবে কি যাবে না তা-ও হতো আমাদের আলোচনার বিষয়। ইন্দিরা রোডের স্যারের ভবন ‘আকাশ প্রদীপ’-এ কতবার যে গেছি, তার কি কোনো সংখ্যা আছে? মনে আছে পূর্ববঙ্গে প্রগতি লেখক সংঘের ইতিহাস বিষয়ে আমাকে দিয়ে স্যার কী প্রয়োজনীয় একটা কাজ করিয়ে নিয়েছিলেন।

    ‘কথামালা’ আর ‘বাঙালির বাংলা’ অনুষ্ঠানে আমি জড়িয়ে ছিলাম নানাভাবে। ‘কথামালা’র বিষয়-নির্বাচন আর বক্তা ঠিক করার ব্যাপারে স্যার আমার সঙ্গে কথা বলতেন—এ কথা ভেবে এখন গৌরব বোধ করছি। ‘কথামালা’ আর ‘বাঙালির বাংলা’র কত অনুষ্ঠানে যে আমি অংশগ্রহণ করেছি। স্যার কেন জানি ভরসা করতেন আমার ওপর। এমনও দেখা গেছে, কোনো বক্তা হয়তো হঠাৎ করে অনুষ্ঠানে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন, কিংবা বন্ধ করে দিয়েছেন যোগাযোগ-সূত্র, সঙ্গে সঙ্গে স্যার আমাকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

    মুস্তাফা নূরউল ইসলাম আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আছে তাঁর সাধনা ও সৃষ্টি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি ছিল তাঁর অবিচল আস্থা। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তিনি গড়তে চেয়েছেন তাঁর প্রিয় শিক্ষার্থীদের—এই যে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। তিনি সব সময় থাকবেন আমাদের সঙ্গে, অনাগতকাল ধরে আমাদের বলে যাবেন এগিয়ে যাবার যথার্থ পথ, দূর থেকে জানিয়ে যাবেন জাতিসত্তার প্রকৃত ঠিকানা।


    রবীন্দ্রনাথের অন্য ভুবন

    90d198731aed7fd9c4c4a447e05c6857 5aec03b97ca57 - রবীন্দ্রনাথের অন্য ভুবন

     

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    লেখক-চিত্রকর—এসব সৃজনশীল পরিচয়ের বাইরেও বিচিত্র কয়েকটি পরিচয় ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, ছিল ভিন্ন এক ভুবন

    সব রাঁধুনি চুলটা ঠিকঠাকমতো বাঁধতে জানেন না। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে পাকা রাঁধুনি ছিলেন। কী, এ কথা শুনে চক্ষু ছানাবড়া


    ‘কোনো লেখাই আমি শেষ করতে পারিনি’

    01142cb4827cffd1caecb730ff2c2f51 5ae2bd1cdf6ed - ‘কোনো লেখাই আমি শেষ করতে পারিনি’

    আমৃত্যু বাউণ্ডুলে ছিলেন তিনি। বেলাল চৌধুরী। ষাট দশকের অন্যতম এই কবি মারা গেছেন সম্প্রতি। তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের আয়োজন

    এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল বেলাল চৌধুরীর পল্টনের বাসায়, ২০১১ সালে। তখন কবির স্মৃতি ছিল উজ্জ্বল। জীবনের নানা গল্প তিনি মেলে ধরেছিলেন এ কথোপকথনে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন লোপা মমতাজ

    লোপা মমতাজ: আপনার নামের সঙ্গে জড়িয়ে


    যুদ্ধদিনের সরল-গরল স্মৃতি

    9f87998c3b0cccf8d2baa2651be166f8 5ad049e7821e0 - যুদ্ধদিনের সরল-গরল স্মৃতি

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    সাম্প্রতিক সময়ে মহিউদ্দিন আহমদ বেশ কিছু আলোচিত বই লিখেছেন। এর সবশেষ সংযোজন এই দেশে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল। বইটি মূলত একাত্তরের আন্দোলন সংগ্রাম, রণাঙ্গনের দিন ও পরবর্তী সময়ে লেখকের স্মৃতিকথা। বইয়ের ভূমিকায় এই স্মৃতিকথা নিয়ে কয়েকটি কথা উল্লেখ করেছেন তিনি, ‘অতীতে যাঁরা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং এখন সন্ত হয়ে গেছেন, তাঁরা অনেকেই প্যানডোরার বাক্সটি খুলতে চান না। এই বইয়ে সেই বাক্সের ডালা আমি একটু খোলার চেষ্টা করেছি।’ লাইনগুলো পড়ে বইটি পড়তে আগ্রহ জাগে বইকি।

    লেখক নিজে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যা দেখেছেন, জেনেছেন, নির্মোহভাবে সেসবের বর্ণনা দিয়েছেন বইয়ে। বাংলাদেশের গ্রামীণ বা শহুরে সমাজ খুব একটা কুটিলতা বা জটিলতামুক্ত ছিল না। এখানে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা রেষারেষি ছিল যেকোনো সমাজের চেয়ে বেশি। সেই পরম্পরায় মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস গ্রামাঞ্চলের মানুষের রেষারেষি আর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দলাদলির এক সরল-গরল চিত্র ধরা পড়েছে এ বইয়ে।

    ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অতিকথনের শেষ নেই। কিন্তু আদতে মুক্তিযুদ্ধ ততটা সরল ব্যাপার ছিল না। যুদ্ধের সময় অনেকেই চালিয়ে গেছেন নিজস্ব কাজ। এক বছর নষ্ট হবে, একটা পরীক্ষা মিস হলে পিছিয়ে পড়বেন—এমন চিন্তা কারও কারও মাথায় ছিল। তার চিত্র পাওয়া যায় এই স্মৃতিকথায়।

    ২৫ মার্চের কালরাত শেষে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয় সামরিক জান্তা। লেখক তখন রণাঙ্গনে। সেখান থেকে তিনি দেখেছেন, ভিন্ন চিত্র—দেশ যখন যুদ্ধে লিপ্ত, কিছু তরুণ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যোগ দেওয়ার জন্য


    বাঙালির রঙ্গ-রসিকতার গল্প

    adf487465f43d2e9b3df8f47941dc1d2 5ad056b273701 - বাঙালির রঙ্গ-রসিকতার গল্প

    ৭১ ডেস্কঃ

    ভূমিকা

     ‘বাঙালির রঙ্গ-রসিকতার গল্প’ শিরোনামেরঙ্গ-রসিকতামূলক এই গল্পগুলোতে বাংলাদেশের বাঙালির স্বকীয় কথনশৈলীর শৈল্পিক প্রকাশ আছে। দৈনন্দিন কর্মসূত্রের বিভিন্ন পরিবেশে প্রসঙ্গক্রমে এই সব রসিকতা কতটা তীক্ষ্ণ-তির্যক, সময় ও পরিবেশের উপযোগী হতে পারে তার নিপুণ উদাহরণ নিচের এই সব গল্প। এর কোনো কোনো রসিকতা এতটাই মোক্ষম যে তা একেবারেই লা-জবাব করে দেয়। কোথাও এসব রচনা হুল ফোটানো, কিন্তু বিদ্বেষহীন; কোথাও-বা ছাদ ফাটানো হাসিতে আসর মাতানো। বাঙালি জীবনের দুঃখ-দারিদ্র্য-দৈন্যের মধ্যে এ ধরনের রঙ্গ-রসিকতা তাঁদের জীবনকে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।

    গ্রামবাংলার এই রঙ্গ-রসিকতার গল্পগুলোতে ঠিক গল্প নেই। আছে গ্রামীণ দেহাতি মানুষের কথার রঙ্গময় বুনন দেওয়া এক কুশলী শিল্প। গ্রামবাংলার গহিন ভেতরের রঙ্গ-রসময় ফল্গুধারায় টইটম্বুর এসব চুটকি। আশা করছি পাঠক এই রঙ্গগল্পগুলোর সামাজিক পটভূমিকার প্রতি খেয়াল রেখে রচনাগুলো পাঠ করবেন। তাহলেই এর সরসতা পাঠককে আনন্দময় করে তুলবে।

    বামুন পণ্ডিত

    বহুদিনের কথা। তখন আধুনিক স্কুল-কলেজ এখনকার মতো এতটা বেশুমার হয়নি। সংস্কৃত পড়ার জন্য টোল আর ফারসি পড়ার জন্য মাদ্রাসা—এই-ই ছিল। স্কুল-কলেজ খুঁজে পাওয়া সে সময় অত সহজ ছিল না।

    সংস্কৃত পড়ার টোলের পণ্ডিত এবং ফারসি পড়ার মাদ্রাসার


    ঠগির দল ও হেনরি স্লিম্যানের অভিযান

    3f42eb6fbfb8588887ff2aed9b127b99 5ad1a6db49e5a 300x241 - ঠগির দল ও হেনরি স্লিম্যানের অভিযান

    পজিটিভ ডেস্কঃ

     

    ১৮০৯ সাল। তরুণ উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান ইংল্যান্ড থেকে বাংলায় এলেন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়। সৈনিক হিসেবে যোগ দিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীতে। অভাবিত উন্নতি করলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ লাইব্রেরিতে পাওয়া পুরোনো একটি বই এলোমেলো করে দিল এই ইংরেজের জীবন।

    বইটির লেখক এম থিভেনট নামে এক ফরাসি পর্যটক। এ বইয়ের প্রতিটি ছত্রে আছে ঠগি নামের ভয়ংকর খুনিদের অজানা গল্প। গল্প নয়, একেবারে সত্য ঘটনা। বইটি প্রায় এক শ বছরের পুরোনো।

    স্লিম্যান বইটি পড়েন। মনে প্রশ্ন জাগে তাঁর, এখনো কি আছে ঠগিরা? না-ই যদি থাকবে, তবে তাদের দমন করল কে?

    ঠগি আছে গোটা বাংলায়, ভারতজুড়েই। শহরের অলিতে-গলিতে, বিজন মরুভূমিতে, নদীতে, পাহাড়ে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ খুনির দল। কিন্তু স্লিম্যান ছাড়া কেউ বিশ্বাস করেন না এ কথা। তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করে লোকজন। বলে, ঠগি হয়তো কোনো এক কালে ছিল ভারতবর্ষে, তবে গত এক শ বছরে তাদের কোনো আলামত তো পাওয়া গেল না, এখন এটা কী বলছেন এই সাদা ইংরেজ, আশ্চর্য তো!

    হাল ছাড়লেন না স্লিম্যান। তক্কে তক্কে থাকলেন। একসময় উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদের কালেক্টর অফিসে তিনি পেলেন ডা. রিচার্ড শেরউডের লেখা ১৭৯৯ সালের ঠগিদের নিয়ে একটি পাণ্ডুলিপি। ঠগিরা নেশার মতো পেয়ে বসল তাঁকে। ঠগিদের সম্পর্কে নানা গল্প ও বিভিন্ন তথ্য জানলেন তিনি। যেমন ঠগি দলে লোকবল থাকে কয়েক শ পর্যন্ত। পথে বেরিয়ে তারা ভাগ হয়ে যায় ছোট ছোট দলে। একেক দল একেক ছদ্মবেশ নেয়। কোনো দল তীর্থযাত্রী, কোনো দলকে দেখে মনে হয় সাধারণ ব্যবসায়ী। হাটে, ঘাটে, মেলায় কিংবা তীর্থস্থানে ওরা পরখ করে লোকজনকে। খোঁজখবর নেয়। যদি বোঝে কারও কাছে টাকা কিংবা মূল্যবান জিনিস আছে, নিঃশব্দে অনুসরণ করে তাকে। তারপর দুর্গম কোনো পথে ঠগির দলটা দেখা দেয় বন্ধুবেশে।

    রাস্তায় কত বিপদ-আপদ। তাই দল ভারী হলে বড্ড সুবিধা। হতভাগা পথচারীরা ঘুণাক্ষরেও টের পায় না বন্ধুবেশে তাদের পিছু নিয়েছে ভয়ংকর খুনির দল। ধীরে ধীরে দুই দলের মধ্যে সৌহার্দ্য হয়। একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খায়। গান-বাজনা চলে। তারপর হঠাৎ আক্রমণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হতভাগ্যদের গলায় পেঁচিয়ে যায় ঠগিদের গামছার মরণ ফাঁস। তারপর গোটা দলটিই যেন মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। কেউ তাদের খোঁজ পায় না। অস্ত্র বলতে তাদের থাকে এক টুকরা গামছা। গামছার এক কোনায় বাঁধা থাকে এক টুকরা পাথর কিংবা দুটি তামার পয়সা। সুযোগ বুঝে হতভাগ্য পথচারীদের গলা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে সেটা। গলায় পেঁচিয়ে যায় গামছা। তখন হ্যাঁচকা টানে শুইয়ে ফেলা হয় পথচারীকে। এরপর চার-পাঁচজন তার পিঠে চেপে বসে মৃত্যু নিশ্চিত করে। কখনো কখনো গামছার বদলে ব্যবহার করা হয় দড়িও।

    এই ঠগিদের সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্যই একসময় সৈনিকের চাকরি ছেড়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিলেন স্লিম্যান। ১৮২২ সাল। গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট হয়ে তিনি গেলেন মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে। তত দিনে ওই বই আর পাণ্ডুলিপি থেকে ঠগিদের চালচলন, আচরণ অনেকটাই জেনে গেছেন, জেনেছেন তাদের নিজস্ব ভাষা সম্বন্ধেও।

    নিকট অতীতের অনেক ঘটনা স্লিম্যান মন দিয়ে শুনেছেন স্থানীয় লোকদের কাছে। খতিয়ে দেখেছেন কোনো ঘটনার সঙ্গে মেলানো যায় কি না ঠগিদের যোগসূত্র।

    একদিন অফিসে বসে স্লিম্যান ভাবছিলেন ঠগিদের কথা। বাইরে ছিল একদল তীর্থযাত্রী। তাদের দেখে তাঁর মনে হলো, এরা ঠগি নয়তো? তারপর আবার ডুবে গেলেন ভাবনায়। হঠাৎ একজনের ডাকে সংবিৎ ফিরল। স্লিম্যান চোখ তুলে দেখলেন দাঁড়িয়ে আছে কল্যাণ সিং। এই কল্যাণ সিংকে তিন মাস আগে জেলে পাঠিয়েছিলেন। লোকটা কোম্পানির এক আস্তাবলে কাজ করত। ঘোড়ার খাবার চুরির অপরাধে জেল হয় তার। বড্ড গরিব। তাই তার পরিবারকে দেখেশুনে রেখেছিলেন স্লিম্যান। এ জন্য লোকটা তাঁকে ধন্যবাদ দিতে এসেছে। কল্যাণ সিংকে স্লিম্যান কিছুক্ষণ আগে দেখেছেন ওই তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে।

    ‘তুমি বদ লোকের সঙ্গ নিয়েছ কল্যাণ সিং।’ আন্দাজে ঢিল ছুড়লেন স্লিম্যান। তারপর ঠগিদের কিছু মুখস্থ স্বভাবের কথা বললেন। ভয় পেয়ে গেল কল্যাণ সিং। ভাবল, দেবতা ছাড়া কারও পক্ষে এসব তো জানার কথা নয়। স্বীকার করে ফেলল সবকিছু। একে একে বলে গেল অনেক রোমহর্ষক কাহিনি। তখন স্লিম্যানকে আর পায় কে!

    ঠগিদের নির্মূল করা উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানঠগিদের নির্মূল করা উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান
    দুই
    ভারতজুড়ে বিশাল এক যোগাযোগ-বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল ঠগিরা। বংশপরম্পরায় তারা বেছে নিত এই পেশা। ঠগির ছেলে তাই ঠগিই হতো। ওদের বিয়ে, আত্মীয়তা সব ছিল ঠগিদের মধ্যেই। বেশির ভাগ ঠগির স্ত্রী-সন্তানেরা জানত না তাদের স্বামী বা পিতা কী করে।

    সরকারি কর্মচারীদের ওপর চড়াও হতো না ঠগিরা, ক্ষতি করত না কোনো সাদা চামড়ার মানুষের। এ কারণে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শত শত বছর ধরে নিঃশব্দে পথচারীদের গায়েব করতে পেরেছিল ওরা।

    কুসংস্কারই ওদের ভয়াবহ খুনি বানিয়েছিল। ঠগিদের বিশ্বাস, ওরা দেবী ভবানীর সন্তান। ভবানী মানে কালী। ওদের বিশ্বাস, তারা নিজেরা মানুষ মারে না। মা ভবানীই ঠিক করেন কে ঠগিদের হাতে মরবে। তাই ওসব মানুষকে মেরে ফেলা ওদের দায়িত্ব। নইলে মায়ের নির্দেশ অমান্য করা হবে যে! স্লিম্যানের হিসাব অনুযায়ী গোটা ভারতে হিন্দু-মুসলমান ঠগিদের সংখ্যা ছিল সমান সমান। মুসলমান ঠগিরা তাদের ধর্মের সব আচার-আচরণ যেমন মেনে চলত, একইভাবে মানত ভবানীকে; মানত ঠগিদের কুসংস্কারও।

    স্লিম্যান মনে করতেন, বাইরে থেকে যতই আলাদা মনে হোক, গোটা ভারতবর্ষে মাকড়সার জালের মতো ছেয়ে আছে ঠগিদের একটাই দল। একদিন এক বন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, ‘একবার একজন ঠগি ধরা পড়লে ওদের জালে টান পড়বে, সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে সব ঠগি।’ হয়েছিলও তাই। কল্যাণ সিং ধরা পড়ার পর মাত্র ২৬ বছরে গোটা ভারত থেকে নির্মূল হয়ে গিয়েছিল এই ভয়ংকর খুনির দল। দেশ উজাড় করে ঠগ বেছে ফেলেছিলেন স্লিম্যান।

    কল্যাণ সিংকে নিয়ে স্লিম্যান নামেন ঠগি শিকারে মাঠে। একটা করে দল ধরেন আর ফাঁসিতে ঝোলান। প্রতিটি দল থেকে দু-একজনকে বেছে নিয়ে রাজসাক্ষী বানাতেন। তাদের মাধ্যমেই মিলত দলের বাকি সদস্যদের খবর। তবু ঠগিদের ধরা অত সহজ ছিল না। অতঃপর ঠগি ধরতে স্লিম্যান অবলম্বন করলেন ঠগিদের পন্থা, ঠগি ধরার বিশাল একটা দল তৈরি করেন তিনি। তারা ব্যবসায়ী কিংবা পথচারীদের ছদ্মবেশে পথে পথে ঘুরে বেড়াত। ঠগির দলকে অনুসরণ করত। আর ঠগিরা ভাবত, নতুন কোনো মক্কেল বুঝি পা দিয়েছে তাদের ফাঁদে। ওদিকে স্লিম্যানের পুলিশ বাহিনী দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করত আগের দলটাকে। যে-ই দেখত ঠগিরা তাদের ফাঁদে পা দিয়েছে, অমনি তারাও এসে হাজির। ঘিরে ফেলত গোটা দলকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঠগিদের আশ্রয় হতো জেলে।

    ঠগিরা যখন ধরা পড়তে শুরু করল, তখন ওদের ভেতরে ভর করল একধরনের আতঙ্ক। ওরা বিশ্বাস করতে শুরু করল, মা ভবানী তাদের ওপর রুষ্ট হয়ে ওদের ছেড়ে চলে গেছেন। নিশ্চয়ই তিনিই স্লিম্যানকে পাঠিয়েছেন ওদের শায়েস্তা করতে। ঠগিদের এই বিশ্বাস সহজ করে দিয়েছিল স্লিম্যানের কাজ। রসন জমাদার, এনায়েত, রুস্তম খাঁ, ফিরিঙ্গিয়া, বুকুত জমাদারের মতো দুর্ধর্ষ ঠগি-সর্দারকে রাজসাক্ষী বানিয়েছিলেন স্লিম্যান। ওদের মুখ থেকেই শুনেছিলেন রক্ত হিম করা ওদের ডাকাতির গল্প। সেসব গল্প তিনি লিখে গেছেন দ্য থাগস অর ফাঁসিগারস অব ইন্ডিয়াবইতে। সেটিই আজ ঠগিদের দুর্ধর্ষ জীবনের অকাট্য দলিল।

    ডাকাতির পর নির্মমভাবে পথচারীকে খুন করছে ঠগিরাডাকাতির পর নির্মমভাবে পথচারীকে খুন করছে ঠগিরা
    পূর্ব বাংলার ঠগিরা
    আমাদের পূর্ব বাংলা চিরকালই নদী-নালার দেশ। এ দেশে স্থলপথে চলার চেয়ে জলপথে চলার সুবিধাই বেশি। জলপথে ঠগিদের সুবিধা অনেক। খুব সহজেই লাশ পানিতে ফেলে কাজ হাসিল করা যায়। জলের এই ঠগিদের নাম পাঙ্গু। সুবন জমাদার নামে এক কুখ্যাত পাঙ্গু ঠগি ধরা পড়ে স্লিম্যানের লোকদের হাতে। সুবন ময়মনসিংহ থেকে রংপুর, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর, মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তুলেছিল তার পাঙ্গু বাহিনী। আর ছিল ঠ্যাঙাড়ে। এরা গামছার বদলে ব্যবহার করত মুগুর। মগুরপেটা করে পথচারীদের হত্যা করত এরা। ধাতুরিয়া নামে আরেকটা দল ছিল। পথিকদের তারা মারত ধুতরার বীজ থেকে তৈরি বিষ দিয়ে।


    বই পরিচিতি

    bdda250683e6579439d886a6400e29c6 5ac71a29418cf - বই পরিচিতি

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    একই সময়ের কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তবে লেখার জগতে দুজনেই ভিন্ন স্বরের। এই বইয়ে আছে ইলিয়াসকে নিয়ে হাসান আজিজুল হকের পর্যবেক্ষণ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচটি প্রবন্ধ লিখেছেন


    এ লেখা লইয়া কী করিব?

    50f67666c6efa64d7fae240cebdb5a85 5ac737095a404 - এ লেখা লইয়া কী করিব?

    পজিটিভ ডেস্কঃ

    বহু কাল আগের কথা। ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ শিরোনামে নতুন লেখকদের প্রতি কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আসছে ৮ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুদিন। এ দিন স্মরণে আজ খুঁজে দেখা হয়েছে অনেক কাল আগের সেই উপদেশমালার প্রাসঙ্গিকতা

    জীবন নিয়ে কমলাকান্তের আর্তনাদ/আত্মজিজ্ঞাসার পরিধিটা একটু বিস্তৃত করলে, এবং কমলাকান্তকে এ যুগের একজন লেখক কল্পনা করলে, শিরোনামের প্রশ্নটি একটি যথার্থতা পায়। খারাপ লেখা হলে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলুন, বঙ্কিমচন্দ্র বলছেন কমলাকান্তকে, ভালো হলে এ নিয়ে ভাবতে থাকুন—যেমন, কাকে শোনাবেন লেখাটা? কোথায় ছাপাবেন? কেন ছাপাবেন? ইত্যাদি। এগুলোর নিষ্পত্তি করেই এগিয়ে যাবেন কমলাকান্ত, বঙ্কিমচন্দ্র তাই ধরে নিচ্ছেন।
    তারও আগে অবশ্য কমলাকান্তকে লেখার কলাকৌশল আর কলকবজা নিয়ে ভাবতে হবে। লেখার অলংকার বিষয়ে তাঁকে পাকা জহুরি হতে হবে। তাঁর চিন্তায় জটিলতা থাকলেও প্রকাশে সারল্য থাকবে। কাউকে তিনি অনুকরণ করবেন না। কবিতা লিখতে বসলে জীবনানন্দ তাঁকে আচ্ছন্ন করলে চলবে না, উপন্যাস লিখতে বসলে গারসিয়া মার্কেজের এক শ হাত দূরে থাকতে হবে।
    এই সব।
    ১৮৮৫ সালে (মাঘ, ১২৯১ বঙ্গাব্দ) বঙ্কিমচন্দ্র ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের’ প্রতি একটি উপদেশমূলক নিবেদন হাজির করেন, যাতে ১২টি সূত্রে তিনি লেখালেখি নিয়ে তাঁর ভাবনাচিন্তাকে সাজান। ১৮৮২ সালের দিকে বঙ্কিমচন্দ্রের মনোজগতে একটা বড় পরিবর্তন হয় বলে তাঁর জীবনীকাররা আমাদের জানান। তিনি পশ্চিম থেকে মুখ ফিরিয়ে ভারতীয় দর্শন, ধর্মচিন্তা ও ভাবধারায় নিজের অবস্থানটি খুঁজে পান। পশ্চিমকে তিনি অবশ্যই ফেলে দেননি, পশ্চিমা সাহিত্য ও দর্শনের তিনি নিবিষ্ট পাঠক থেকে যান, কিন্তু স্বজাতিচিন্তা ও ভারতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর একটি অহংকার জাগে, তিনি ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে আংশিক উত্তর-উপনিবেশী অবস্থানে নিজেকে স্থাপন করেন।
    কমলাকান্তকে বাদ দেওয়া যাক—১৮৮৫ ও ২০১৮-এর মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমাদের নব্য লেখকেরা যে সময়ে আছেন, তা ১৮৮৫-এর আফিমসুখী কমলাকান্তের কল্পনাতেও হয়তো আসত না। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশগুলো তো আর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েনি। অর্থাৎ, এর অনেকগুলো এখনো সচল মুদ্রা। এবং মুদ্রাগুলো কেন সচল অথবা কেন অচল—এ বিষয়ে আমাকে লিখতে বলেছেন প্রথম আলোর সাহিত্য সম্পাদক মহোদয়।
    প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, কোন লেখক—নব্য অথবা অনব্য—কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, তা নিয়ে কারও উপদেশ দেওয়াটা আমার পছন্দ নয়। লেখক যত বড়ই হন, তাঁর উপদেশ মেনে কেউ যে ভালো লেখক হয়ে যেতে পারেন, তা আমি মনে করি না। তবে দু-এক উপদেশ মনে রাখা ভালো, তাতে লেখার আগে কিছু চিন্তা পরিষ্কার হয়, লেখার সময় কিছুটা উপকার হয়তো পাওয়া যায় এবং লেখা শেষ হলে তার প্রকাশ ও অন্যান্য বিষয়ে একটা পথনির্দেশনা হয়তো মেলে। অর্থাৎ, লিখতে বসে যতটা না সহায়তা করবে উপদশেগুলো, লেখা শুরুর আগে ও লেখা শেষ হলে—লেখা-ব্যবস্থাপনায়—করবে তার চাইতে বেশি।
    এজরা পাউন্ডের একটি উপদেশসূত্র আমি আধুনিক পশ্চিমা সাহিত্যের ক্লাসে কয়েক বছর পড়িয়েছি। লেখাটি হচ্ছে ‘আ রেট্রোস্পেক্ট’ এবং এটা ১৯১৩ সালে পোয়েট্রি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। এতে পাউন্ড কবিদের বলেন, বিষয়ের সরাসরি উপস্থাপনা করবেন; কবিতার প্রকাশে যেসব শব্দ কোনো ভূমিকা রাখে না, সেগুলো একেবারেই পরিহার করবেন এবং সাঙ্গিতিক শব্দবন্ধে কবিতা লিখবেন। ইত্যাদি। খুব ভালো উপদেশ। কিন্তু এগুলো মেনে কবিতা লিখে বিখ্যাত হয়েছেন, এমন কবির সন্ধান আমি পাইনি।
    বঙ্কিমচন্দ্র নিজে তাঁর দেওয়া উপদেশ কতটা মেনেছেন, তা গবেষণার বিষয় বটে, তবে তিনি তো ১৮৮৫ সালে আর নব্য লেখক ছিলেন না। যখন ছিলেন, তখন এসব উপদেশ তাঁর মাথায় ছিল কি না কে জানে, থাকলে তাঁর লেখা নিশ্চয় আরও সরল হতো, তিনি হয়তো ‘ইংরেজ ভারতবর্ষের পরমোপকারী’ অথবা শেক্সপিয়ারের উপনিবেশী ঠাকুর প্রসপেরো যে ‘ঋষিতুল্য’—এসব কথা লেখার আগে দুবার ভাবতেন। তবে উপদেশ দেওয়ার একটি আনন্দ হলো, নিজে তা অনুসরণ না করলেও চলে, যেহেতু উপদেশদানকারী একটি উঁচু আসনে বসেই সৎকর্মটি করেন।
    বঙ্কিমচন্দ্র অবশ্য সৎকর্ম হিসেবেই ১২ সূত্রের উপদেশ দিয়েছেন। এ জন্য একে সম্মান করতে হবে।
    ২০১৮ সালের নব্য লেখক তাঁর কয়েকটি উপদেশ মনে রাখতে পারেন, যেমন ‘যশের জন্য লিখিবেন না।’ এবার ফেব্রুয়ারির বাংলা একাডেমির বইমেলায় যাঁদের বই ছাপা হলো, তাঁদের অনেকের মধ্যে যশাকাঙ্ক্ষা তীব্র ছিল। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বইয়ের বাজারে একটা শোরগোল তোলা অনেকের উদ্দেশ্য ছিল।
    বইয়ের সঙ্গে যখন নিজের রঙিন ছবিটিও (বইয়ের প্রচ্ছদ থেকেও কলাম-ইঞ্চিতে যা বড়) ছাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ধরে নিতে হবে তিনি বইভিত্তিক ও চেহারাভিত্তিক স্বীকৃতি ও যশ—উভয় প্রত্যাশা করেন। ফেসবুকে বই নিয়ে যে প্রচার চলে, তাতেও যশ-প্রত্যাশার আকাঙ্ক্ষা প্রবল।
    বঙ্কিম বলেন, ‘তাহাতে যশও হয় না, লেখাও ভালো হয় না।’ এই উপদেশের পাশে V. V. Imp লিখে রাখুন।
    বঙ্কিমচন্দ্র আরও বলেন, যদি ‘বুঝতে পারেন যে লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন।’ কথাটা এ সময়ের নব্যলেখকদের নিশ্চয় ধন্দে ফেলবে। দেশ বা মনুষ্যজাতির মঙ্গল একজন লেখক কতটা এবং কীভাবে করবেন? তিনি তো কবিতা-গল্প-নাটক লেখেন, প্রবন্ধ রচনা করেন, মরণব্যাধির ওষুধ তৈরি করেন না। বই পড়ে এখন মানুষ কি বদলে যায়, খারাপ মানুষ ভালো মানুষ হয়ে যায়? কে জানে। একজন লেখক লেখেন লিখতে ইচ্ছে হয়, আনন্দ হয় বলে। এত বিশাল বঙ্কিমী উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে গেলে লেখাটা ভাববাদী হয়ে যাবে, এর ভেতরের আনন্দ সংকটে পড়বে। হিতকারী লেখালেখির দিন কি এখনো আছে?
    ‘টাকার জন্য লিখবেন না।’ বঙ্কিম বলেন। নব্য লেখক তাঁর সময়ে যেমন ছিলেন, আমাদের সময়েও তেমন, বাজারের বিচারে প্রান্তজন। টাকা যে আদৌ পাবেন, সেই নিশ্চয়তাও তো কোনো নব্য লেখকের নেই। টাকা পাবেন কি, গাঁটের পয়সা খরচ করে বই ছাপান অনেক নব্য লেখক। বাংলাদেশে লিখে টাকা পান হাতে গোনা কয়েকজন লেখক, প্রকাশকেরা টাকার ব্যাপারে যেহেতু খুবই সতর্ক। বঙ্কিমচন্দ্র প্রকাশকদের জন্য কোনো উপদেশবাণী রেখে গেছেন কি না, জানি না। ‘লেখকদের টাকা মারিয়া দেবেন না, ইহাতে জ্ঞানজগতের যেমন ক্ষতি, তেমনি মনুষ্যসমাজেরও’—এমন কথা তিনি বললে হয়তো কিছু প্রকাশক লেখকবান্ধব হতেন।
    খুব ভালো একটি উপদেশ হলো ‘যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না।’ এক তরুণ লেখক গত বইমেলায় আমাকে জানালেন, তাঁর পাঁচটি উপন্যাস মেলায় এসেছে। এক বছরে পাঁচটি উপন্যাস! তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশ শুনে উপন্যাসগুলো কয়েক বছর ফেলে রেখে সংশোধন করলে হয়তো এক বছরের ৫টি x কয়েক বছর=অসংখ্য উপন্যাস একটি বা দুটি উপন্যাস হিসেবে ছাপতে দিতেন।
    বৃক্ষেরা তাঁকে সাধুবাদ দিত। পাঠকেরাও।
    বঙ্কিম বলেন, যে বিষয়ে যার অধিকার নেই, সে বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ করাটা অকর্তব্য। এটি মনে রাখার মতো একটি উপদেশ। তিনি আরও বলেন, বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করবেন না, বিদ্যা আপনিতেই প্রকাশ পায়।
    ১৮৮৫ আর ২০১৮ সালের বাস্তবতার মধ্যে তাহলে এই একটা ব্যাপারে ফারাক নেই।
    অলংকার নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র কয়েকটি উপদেশ দিয়েছেন—‘অলংকার প্রয়োগে রসিকতার জন্য চেষ্টিত হইবেন না।’ তিনি বলেন এবং বুঝিয়েছেন, ব্যঙ্গ কৌতুক ও অন্যান্য ‘সামগ্রী’ যার আছে, তার আছে; না থাকলে চেষ্টিত হয়েও লাভ নেই।
    খাঁটি কথাই বটে।
    অলংকারের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, অলংকারের সুন্দর একটা প্রয়োগ হয়েছে ভেবেও তা বারেবারে বাজিয়ে দেখবেন, বন্ধুবর্গকে কয়েকবার পড়ে শোনাবেন। যদি প্রকৃতই সুন্দর হয়, আপনার পড়তে লজ্জা করবে না। প্রকৃত না হলে পড়তে লজ্জা হবে। অর্থাৎ ‘এ অলংকার লইয়া আমি কী করিব’ ধরনের গ্লানি আসবে। বঙ্কিমের ‘বন্ধুবর্গের’ জায়গায় লিখুন ‘ফেসবুকের বন্ধুবর্গ’, যেহেতু আপনার কবিতা-গল্প শোনার মতো ধৈর্য কাছের বন্ধুটিরও আর নেই।
    তারপর বঙ্কিম বলেছেন সরলতার কথা। সরলতার কোনো বিকল্প নেই। এই একটি উপদেশ বড়ই খাঁটি, যদিও মানাটা সবচেয়ে কঠিন।
    দুটি নীতিধর্মী উপদেশ বঙ্কিমচন্দ্র দিয়েছেন—একটি হলো, যা অসত্য, ধর্মবিরোধী, যা পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধনের কাজে লাগে, তা পরিহার্য। এই উত্তরাধুনিক যুগে সত্য-অসত্য, পরনিন্দা-পরবয়ানে যে ঠোকাঠোকি লাগে, ধর্মের ব্যাখ্যা নিয়ে ধাঁধার সৃষ্টি হয়, তাতে এই উপদেশ একটা জটিল ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে ওঠে। তা ছাড়া, তিনি যখন লেখেন, ‘সত্য ও ধর্ম্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য’, তখন প্রশ্ন জাগে, কার সত্য ও কোন ধর্মের কথা তিনি বোঝান?
    দ্বিতীয় নীতিকথাটি হলো, ‘যে কথা প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না।’ প্রবন্ধ বা সংবাদপত্রের কলামের ক্ষেত্রে কথাটি হয়তো খাটে, কিন্তু কবিতা-গল্প-উপন্যাসের বেলায়?
    জাদুবাস্তবতা তাহলে কোথায় পালায়? কবিতার অতিকথন বা hyperbole?
    এক জায়গায় বঙ্কিমচন্দ্র ‘যাত্রাওয়ালাকে’ ‘নীচ’ ব্যবসায়ী বলেছেন। তাঁর এই কথায় মনে কষ্ট পেয়ে হয়তো এ যুগের যাত্রাওয়ালারা যাত্রানাটকে প্রিন্সেসদের নাচ দেখিয়ে টু পাইস কামাই করতে চেষ্টিত হয়েছেন। বেচারাদের কেন তিনি নীচ বলছেন?

    দুই.
    আমি নব্য লেখক নই, আমি বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশমালাকে, এজরা পাউন্ডের নসিহতনামার পাশে রেখে পড়লেও সেগুলোকে তেমন গ্রাহ্য না করলেও পারি। কিন্তু নব্য লেখকেরা যদি এগুলো পড়েন, এগুলো নিয়ে ভাবেন এবং যেটুকু যুক্তিযুক্ত মনে করেন, সেটুকু গ্রহণ করেন, ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি বেগে হইতে থাকিবে’ (বঙ্কিমের শেষ কথা) কি না কে জানে, কিন্তু কিছু সুসম্পাদিত লেখা হয়তো জাতি পাবে; অনেক খারাপ লেখা অপ্রকাশিত থেকে যাবে।

    বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    * যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভালো হইবে না। লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে।
    * টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায়; লেখাও ভালো হয়। কিন্তু আমাদের এখনো সে দিন হয় নাই। এখন অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে লোকরঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে। এখন আমাদিগের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করিয়া লোকরঞ্জন করিতে গেলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হইয়া ওঠে।
    * যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্য লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।
    * যাহা অসত্য, ধর্ম্মবিরুদ্ধ; পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধন যাহার উদ্দেশ্য, সে সকল প্রবন্ধ কখনো হিতকর হইতে পারে না, সুতরাং তাহা একেবারে পরিহার্য। সত্য ও ধর্ম্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ।
    * যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না। কিছু কাল ফেলিয়া রাখিবেন। কিছু কাল পরে উহা সংশোধন করিবেন। তাহা হইলে দেখিবেন, প্রবন্ধে অনেক দোষ আছে। কাব্য-নাটক-উপন্যাস দুই-এক বৎসর ফেলিয়া রাখিয়া তারপর সংশোধন করিলে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। যাঁহারা সাময়িক সাহিত্যের কার্যে ব্রতী, তাঁহাদের পক্ষে এই নিয়ম রক্ষাটি ঘটিয়া ওঠে না। এ জন্য সাময়িক সাহিত্য, লেখকের পক্ষে অবনতিকর।
    * যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য। এটি সোজা কথা কিন্তু সাময়িক সাহিত্যে এ নিয়মটি রক্ষিত হয় না।
    * বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করিবেন না। বিদ্যা থাকিলে তাহা আপনিই প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিতে হয় না। বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের অতিশয় বিরক্তিকর এবং রচনার পারিপাট্যের বিশেষ হানিজনক। এখনকার প্রবন্ধে ইংরাজি, সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মান, কোটেশন বড় বেশি দেখিতে পাই। যে ভাষা আপনি জানেন না, পরের গ্রন্থের সাহায্যে সে ভাষা হইতে কদাচ উদ্ধৃত করিবেন না।
    * অলংকার-প্রয়োগ বা রসিকতার জন্য চেষ্টিত হইবেন না। স্থানে স্থানে অলংকার বা ব্যঙ্গের প্রয়োজন হয় বটে; লেখকের ভান্ডারে এ সামগ্রী থাকিলে, প্রয়োজনমতে আপনিই আসিয়া পৌঁছিবে—ভান্ডারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না। অসময়ে বা শূন্য ভান্ডারে অলংকার প্রয়োগের বা রসিকতার চেষ্টার মতো কদর্য আর কিছুই নাই।
    * যে স্থানে অলংকার বা ব্যঙ্গ বড় সুন্দর বলিয়া বোধ হইবে, সেই স্থানটি কাটিয়া দেবে, এটি প্রাচীন বিধি। আমি সে কথা বলি না। কিন্তু আমার পরামর্শ এই যে, সে স্থানটি বন্ধুবর্গকে পুনঃ পুনঃ পড়িয়া শুনাইবে। যদি ভালো না হইয়া থাকে, তবে দুই-চারিবার পড়িলে লেখকের নিজেরই আর উহা ভালো লাগিবে না—বন্ধুবর্গের নিকট পড়িতে লজ্জা করিবে। তখন উহা কাটিয়া দেবে।
    * সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা। যিনি সোজা কথায় আপনার মনের ভাব সহজে পাঠককে বুঝাইতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কেননা, লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বুঝুন।
    * কাহারও অনুকরণ করিও না। অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না। অমুক ইংরাজি বা সংস্কৃত বা বাঙ্গালা লেখক এইরূপ লিখিয়াছেন, আমিও এরূপ লিখিব, এ কথা কদাপি মনে স্থান দিয়ো না।
    * যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না। প্রমাণগুলি প্রযুক্ত করা সকল সময়ে প্রয়োজন হয় না, কিন্তু হাতে থাকা চাই।
    বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা। এই নিয়মগুলি বাঙ্গালা লেখকদিগের দ্বারা রক্ষিত হইলে, বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি বেগে হইতে থাকিবে।


    বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তব

    9ee945664ab003907d50b270a3a761d1 5ac724a6cd8b9 - বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তব

    জাদুবাস্তববাদ কি কেবল লাতিন আমেরিকার সৃষ্টি? বাংলা অঞ্চলে জাদুবাস্তববাদের গড়নটি কেমন? মূল বাংলায় লেখা এই প্রবন্ধে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছেন জার্মানির গবেষক হান্স হার্ডার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে এই প্রবন্ধটি পড়েছিলেন তিনি

    ১. ভূমিকা

    কলম্বিয়া দেশের মাকন্দো গ্রামটা একটা কাল্পনিক জায়গা। সেই গ্রামের অধিবাসী বুয়েন্দিয়া পরিবারের তিন-চার পুরুষের ইতিবৃত্তটাও কাল্পনিক। কিন্তু আখ্যানটি যে ধরনের পরিবেশে স্থাপিত, সেটা কাল্পনিক হলেও পুরোপুরি সম্ভবপর।